ভাইরাল কবিতাওয়ালা : কবি আজিবর
আজিবর মণ্ডল: মাঠের আল থেকে শব্দের আকাশে
নদিয়ার করিমপুর থানার অন্তর্গত কিশোরপুর—একটি নামহীন গ্রাম। চারপাশে ধূ ধূ মাঠ, খোলা আকাশ, মাটির গন্ধে ভরা বাতাস। এখানে কবিতা সাধারণত বইয়ের পাতায় থাকে না, থাকে ধানের শীষে, মাটির ঢেলায়, লাঙলের ফালে। সেই গ্রামেই থাকেন আজিবর মণ্ডল—পেশায় চাষি, কিন্তু স্বভাবে কবিতার মানুষ।
মাথায় গামছার ফেট্টি, মুখে লেগে থাকা এক চিরচেনা হাসি। মাঠের আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থমকে দাঁড়ান তিনি—তারপর শুরু হয় কবিতা। কোনো মঞ্চ নেই, নেই আলো-ছায়ার কারুকাজ। তবু তাঁর কণ্ঠে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শুধু কবিতার জন্য’, জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’ কিংবা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘অমলকান্তি’ শুনলে মনে হয়, কবিতারা যেন বহুদিন পর নিজের বাড়ি ফিরে এসেছে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—
“ওরা মাঠে মাঠে
বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে…”
কিন্তু তিনি হয়তো ভাবেননি, সেই বীজ বোনা হাতই একদিন শব্দ বুনবে মানুষের মনে। আজিবর সেই ব্যতিক্রম। মাটি তাঁর জীবিকা, আবার কবিতাই তাঁর নিঃশ্বাস।
উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা। তার পর জীবনের ভার। মা চলে গেছেন, সংসারের দায় কাঁধে। মেজদা একা লাঙল টানেন—তাই আজিবরেরও মাঠে নামা। পড়াশোনা থেমে গেছে ঠিকই, কিন্তু কবিতার পড়া থামেনি কখনো। তাঁর কথায় কোনো আক্ষেপ নেই, আছে একরাশ সৎ স্বীকারোক্তি—
“অজুহাত দিতে চাই না। ইচ্ছে করলেই পড়াশোনা করা যেত। কিন্তু ওই যে… বয়সের দোষ।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘কবিতাওয়ালা’ নামের পাতায় তাঁর কবিতাপাঠ এখন লক্ষ লক্ষ মানুষের মন ছুঁয়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে ফোন আসে। প্রশংসা আসে, শুভেচ্ছা আসে। তবু ‘খ্যাতি’ শব্দটা শুনলেই একটু থমকে যান তিনি। মুচকি হেসে বলেন,
“কবিখ্যাতি বড় বিষম বস্তু।”
এই কথার মধ্যে রসিকতা আছে, আবার গভীর উপলব্ধিও আছে। কারণ আজিবরের কাছে কবিতা কোনো অর্জনের সিঁড়ি নয়—কবিতা তাঁর বদভ্যাস, তাঁর একান্ত আশ্রয়। নিজেকে কবি বলতে তাঁর প্রবল আপত্তি।
“টুয়েলভ পাশ একজন যদি খানিক লিখে কবি হয়ে যান, সেটা বাংলা সাহিত্যের অন্যায়,”—বলেই হাসেন তিনি।
ভাইরাল হওয়ার গল্পটাও তেমনই সাদামাটা।
“একদিন ধূমপান করতে করতে মনে হল, একটা কবিতা বলি। ফোন অন করলাম, ভিডিও করলাম, ফেসবুকে দিলাম। দেখলাম মানুষ পছন্দ করছে—ব্যস!”
আজিবর মণ্ডল আমাদের মনে করিয়ে দেন—কবিতা শুধু শহরের ক্যাফে বা বইমেলার মঞ্চে জন্মায় না। কবিতা জন্মায় মাঠে, খেতে, ঘামে, মাটিতে। কখনো কখনো লাঙল ধরা হাতেই শব্দের সবচেয়ে গভীর চাষ হয়।
আর সেই কবিতার ফসল, নিঃশব্দে আমাদের মন ভরে তোলে।
